মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০০ অপরাহ্ন

তালাকের নোটিশ না দিলেও তালাক কার্যকর হবে;জিয়াবুল

এড জিয়াবুল আলম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ১০৯৬ বার পঠিত

তালাকের নোটিশ না দিলেও তালাক কার্যকর হবে। তালাকের নোটিশ না দিলে তালাক হবেনা এমন কথা আইনে কোথাও বলা নেই

বেশ কিছুদিন ধরে এক ক্রিকেটারের বিবাহ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। আগের স্বামীর দাবি হচ্ছে তালাকের নোটিশ না দিয়ে বিবাহ পড়ে কেমনে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে তালাকের নোটিশ না দিলে কি বিবাহ ভঙ্গ হবেনা? সাধারণ ইসলামি শরীয়া মতে মেয়েরা তালাক দিতে পারেনা। তবে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশের ৮ ধারা মোতাবেক মেয়েরা তালাক দিতে পারে। তবে ৭ ধারা অনুসরণ করে।
তবে স্ত্রী তিনভাবে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাইতে পারে-
১. তালাক-ই-তৌফিজ,
২. খুলা,
৩. আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ।

নিকাহনামার ১৮ নং ঘরে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পন করে থাকে, সে ক্ষমতার বলে স্ত্রী যদি স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চায় তাহলে সে বিচ্ছেদকে তালাক-ই- তৌফিজ বলে। তালাক-ই-তৌফিজের ক্ষেত্রে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারবারিক অর্ডিন্যান্সের ৭ ধারায় বর্ণিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।

তালাক-ই-তৌফিজ স্ত্রীর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নয়৷ এটি স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা। নিকাহনামা বা কাবিননামার ১৮ নং ঘরে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছে কিনা? করে থাকলে কি শর্তে? এই প্রশ্নটি ছাপা থাকে। স্বামীর যে তালাক দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে সে ক্ষমতাটি যদি স্বামী স্ত্রীকে কাবিননামার ১৮ নং ঘর পূরণের মাধ্যমে প্রদান করে তবে স্ত্রী নিজ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা শর্তযুক্ত বা শর্তহীন হতে পারে। স্ত্রী কর্তৃক এরূপ তালাক উচ্চারণ করা হলে বা বিয়ে ছিন্ন করা হলে সে তালাকের নাম তালাক-ই-তোফিজ৷

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে অত্যন্তÍ সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কি কি কারণে একজন স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবে।নিম্ন কারণগুলি হলঃ
১. চার বৎসর পর্যন্ত স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে।
২. দুই বৎসর স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হলে।
৩. স্বামীর সাত বৎসর কিংবা তার চেয়েও বেশী কারাদন্ড হলে।
৪. স্বামী কোন যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত তিন বছর যাবৎ দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।
৫. বিয়ের সময় পুরষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়ের করা পর্যন্ত বজায় থাকলে।
৬. স্বামী দুই বৎসর ধরে পাগল থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিতে বা মারাত্মক যৌন ব্যধিতে আক্রান্ত থাকলে।
৭. বিবাহ অস্বীকার করলে। কোন মেয়ের বাবা বা অভিভাবক যদি ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে মেয়ের বিয়ে দেন, তা হলে মেয়েটি ১৯ বছর হওয়ার আগে বিয়ে অস্বীকার করে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে, তবে যদি মেয়েটির স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য সর্ম্পক (সহবাস) স্থাপিত না হয়ে থাকে তখনি কোন বিয়ে অস্বীকার করে আদালতে বিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারে।
৮. স্বামী ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান লংঘন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে।
৯. স্বামীর নিষ্ঠুরতার কারণে।
উপরে যে কোন এক বা একাধিক কারণে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে।এখানে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর। কারণ সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ সালের ১০১ ধারা মতে কোন কিছুর অয়িত্ব প্রমাণের দায়িত্ব বাদির। উপরোক্ত শর্তগুলোর যে কোন একটি প্রমাণিত হলে স্ত্রী বিচ্ছেদের পক্ষে ডিক্রি পেতে পারে, আদালত বিচ্ছেদের ডিক্রি দেবার পর সাত দিনের মধ্যে একটি সত্যায়িত কপি আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবে।
১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যান নোটিশকে তালাক সংক্রান্ত নোটিশ হিসেবে গণ্য করে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নিবে এবং চেয়ারম্যান যেদিন নোটিশ পাবে সে দিন থেকে ঠিক নব্বই দিন পর তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

স্বামীর আদালত স্বীকৃত নিষ্ঠুর ব্যবহার সমূহ
ক) অভ্যাসগতভাবে স্ত্রীকে আঘাত করলে বা নিষ্ঠুর আচরণ করলে, উক্ত আচরণ দৈহিক পীড়নের পর্যায়ে না পড়লেও, তার জীবন শোচনীয় করে তুলেছে এমন হলে।
খ) স্বামী খারাপ মেয়ের সাথে জীবনযাপন করলে।
গ) স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করলে।
ঘ) স্ত্রীর সম্পত্তি নষ্ট করলে।
ঙ) স্ত্রীকে ধর্মপালনে বাধা দিলে।
চ) একাধিক স্ত্রী থাকলে সকলের সাথে সমান ব্যবহার না করলে।
ছ) এছাড়া অন্য যে কোন কারণে (যে সকল কারণে মুসলিম আইনে বিয়ের চুক্তি ভঙ্গ করা হয়)।
এই হচ্ছে স্ত্রী কতৃক স্বামীকে তালাকের কথা।

★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★★
এখন কথা হচ্ছে তালাক দিতে হলে অবশ্যই নোটিশ দিতে হবে কিংবা তালাকের নোটিশ না দিলে কি তালাক হবেনা?
এই সংক্রান্ত উপরের বর্ণিত আইনসহ The Muslim marriage and divorce registration আইন ১৯৭৪ সালের কোথাও বলা নাই। তাই তালাক নোটিশ না দিলেও তালাক কার্যকর হবে। এই সংক্রান্ত একটি উচ্চ আদালতের রোলিং হচ্ছে, মা মাউ বনাম কালান্দর আম্মাল (১৯২৭),৫৪ আই.এ মামলায় স্পষ্ট বলা আছে তালাক মৌখিক কিংবা লিখিত হতে পারে। এই মামলার সিধান্ত থেকে বলতে পারি তালাক মৌখিক দিলেও কার্যকর হবে।কারণ নোটিশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি কার্য সম্পাদন হয়েছে বা হবে এই মর্মে জ্ঞাত করা। সুতরাং প্রতিপক্ষকে তালাক সম্পর্কে জ্ঞাত করলে নোটিশ হিসাবে গণ্য করা হয়।এই সম্পর্কে উচ্চ আদালতের অনেক রুলিং আছে।

এখন অনেকের মতে বিবাহ বলবৎত থাকা অবস্হায় যদি বিবাহ করে তাহলে দন্ড বিধির ৪৯৫ ধারা মতে শাস্তির ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এখন দেখা যাক দন্ড বিধির ৪৯৫ ধারার উপাদান কি?

দন্ড বিধির ৪৯৫ ধারা উপাদাল হলঃ
যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা পূর্ববর্তী বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এখানে আইনের ধারাটি ব্যাখ্যা করলে বুঝা যায় যে, দন্ড বিধির ৪৯৫ ধারা ক্রিকেটারের স্ত্রীর জন্য আসবেনা। কারণ তার বর্তমান স্বামীর কাছে সে পূর্বের বিবাহ গোপন করেনি। বরং বর্তমান স্বামী অকপটে স্বীকার করছে যে তার বর্তমান স্ত্রীর পূর্বের স্বামী ছিল সে জানে। সুতরাং ৪৯৫ ধারা কখনো প্রয়োগ হবেনা।
তবে হ্যা আইনের প্রাথমিক ভাষ্যমতে দন্ড বিধির ৪৯৪ ধারা তার সাবেক স্ত্রীর জন্য মামলা দায়ের করিতে পারে। কারন ৪৯৪ ধারার মূল উপাদান হল.ঃ
যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তবে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সালের ১৯৮ ধারা মতে দন্ড বিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৭ ধারার অপরাধ গুলো সংক্ষুব্ধ ব্যাক্তি ছাড়া অন্য কেউ দায়ের করতে পারেনা। এখানে ক্রিকেটারের বর্তমান স্ত্রীর সাবেক স্বামী সংক্ষুব্ধ কিনা?
দেশের প্রচলিত বিধান মতে সে সংক্ষুব্ধ নয়।কারণ তার দাবি হচ্ছে তালাকের নোটিশ পায়নি। তালাক কার্যকর করার জন্য আইনের কোথাও নোটিশ বাধ্যতামূলক নয়।পক্ষে ইচ্ছায় উপযুক্ত কার্যক্রম যথেষ্ট। সুতরাং দেশের প্রচলিত বিধান মতে ক্রিকেটার কিংবা স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা অচল। হয়তো বা প্রাথমিক ভাবে আমলে নিতে পারে বিচারে বাদি উপযুক্ত প্রতিকার পাবেনা।কারণ ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারা মতে তিন ধরণের মানুষ ফৌজদারী মামলা দায়ের করতে পারে। যেমন,
ক।যে দেখেছে
খ।যে শুনেছে
গ।যে সংক্ষুব্ধ হয়েছে
যেহেতু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারা সুস্পষ্ট ভাবে বলা আছে দন্ড বিধির ৪৯৪ ধারার মামলা সংক্ষুব্ধ ছাড়া কোন আদালত মামলা আমলে নিতে পারেনা। সুতরাং এই খানে মামলার বাদী সংক্ষুব্ধ হয়নি। আইনুযায়ী এই মামলা অচল।কারণ তালাকের নোটিশ বাধ্যতামূলক নয়।এই সংক্রান্ত The Muslim family law ordinance 1961 এবং The muslim marriage and divorce registration act 974 এবং The muslim shariah law 1937 সালের আইনে কোথায় বলা হয়নি যে নোটিশ না দিলে তালাক হবেনা। সুতরাং নোটিশ না দিলেও তালাক কার্যকর হবে।

বিদ্রঃ এখানে সাবেক স্বামীকে সংক্ষুব্ধ বলা যাচ্ছেনা এই জন্য যে, যেহেতু বিবাহ বলবৎ নেই।

জিয়াবুল আলম
আইনজীবী

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By Bangla Webs
error: Content is protected !!